জন্মালে মরতে হবে এটাই স্বাভাবিক এবং চিরসত্য। তবে এই মরণের মাঝে কিছু মরণ থাই পাহাড়ের চেয়ে ভারী বোধ হয়। জাতীয় নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়ার মৃত্যু সে কথাটি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে অনেককেই। মানুষ মাত্রই দোষে এবং গুণে সমৃদ্ধ। কোনো মানুষই বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না, থাকেও না। যাদু মিয়ার সম্পর্কেও বিতর্ক দীর্ঘসময়ের।
আমাদের রাষ্ট্রে এবং সমাজে রাজনৈতিক প্রশ্নের জটসমূহ যখন জটিল থেকে জটিল আকার ধারণ করতে থাকে, যাদু মিয়া সম্পর্কিত বিতর্কও নতুন নতুন মাত্রা অর্জন করতে থাকে।
রাজনীতিতে একটি অংশ তাঁকে একেবারে খারিজ করতে পারলে বেঁচে যান মনে হয়। আর অন্য অংশটি খুব বেশী স্মরণের প্রয়োজনও বোধ করে না, এই জন্য যে তাকে স্মরণ করলে কৃত্রিমভাবে তৈরি অনেক মহানায়ককে পিছনের টেবিলে বসাতে হয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যে দলটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, নিজের দলের প্রতীক তুলে দিয়েছেন তাদের হয়ত মনেই নেই বা তারাও মনে করতে চায় না মশিউর রহমান যাদু মিয়া নামে কেউ জড়িত ছিলেন তাদের জন্মের বেদনার সাথে।
জীবন ও প্রাপ্তির পূর্ণতার মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকে চিরকালই। তবে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে তা একইভাবে দেখা যায় না। কারও কারও জীবনে প্রাপ্তি ও পূর্ণতার একসাথে সমন্বয় হয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসাবে দেখা দেয়। যার জীবনে সেটা দেখা দেয় সাধারণ মানুষ সে জীবনকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে এবং স্মরণ করে। আমাদের কাছে এমনই একজন মানুষ হচ্ছেন জাতীয় নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া।
যাদু মিয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ১৯৭৯ সালের ১২ মার্চ, পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ৪৬ বছর। কিন্তু যে জীবনকে রেখে গেছেন অসংখ্য অনুসারী, অনুরাগী ও গুণ মুগ্ধ করদের মাঝে-সে জীবনের মৃত্যু নাই। সে জীবন বেঁচে থাকে কালের যাত্রা পথে, মানুষের জীবন চলার পথের আলোকবর্তিকা হিসাবে। জীবনের যে পরিচয় যাদু মিয়া রেখে গেছেন তার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। পঞ্জিকার হিসাবে তা সারে চার দশক পার হয়ে গেছে। নশ্বর মানুষের জন্য এ এক পরিপূর্ণ জীবনই বটে-যদিও কখনো কখনো তা ঈর্ষণীয়।
১৯২৪ সালের ৯ জুলাই নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছাত্রজীবনেই গণমানুষের কল্যাণে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি বার্মা গিয়ে যুদ্ধাহতদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। তেতাল্লিশ মহাদুর্ভিক্ষের সময় রংপুরের চরাঞ্চলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। এর স্বীকৃতিস্বরূপ তার নামানুসারে একটি চরের নাম হয় ‘যাদুর চর’। ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার সময় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির লক্ষ্যে হত্যাযজ্ঞের বীভৎসতার ছবি তুলে বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করেছিলেন। ফলে ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে। দিল্লিতে তার বিচার অনুষ্ঠিত হয়। তার যুক্তির কাছে সরকার পরাজিত হয়ে বিশেষ স্কোয়াড দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেয়। তার প্রচেষ্টায়ই সেই অঞ্চলে দাঙ্গা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে জেলা বোর্ডের কনিষ্ঠ চেয়ারম্যান হিসেবে পরপর দু’বার নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের যুব উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। একই সালে মওলানা ভাসানীর আহ্বানে কাগমারী সম্মেলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ১৯৬২ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং পার্লামেন্টে বিরোধী দলের উপনেতা ছিলেন। ১৯৬৩ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্য গ্রেপ্তার হন। ষাটের দশকের শেষ দিকে ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক হন এবং আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার দাবি উপস্থাপন করেন। ভাসানীর আহ্বানে জাতীয় পরিষদের সদস্যপদ ত্যাগ করেন।
১৯৬৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের টোবাটেকসিংয়ে কৃষক সম্মেলনে ইয়াহিয়া খানকে গাদ্দার বলার কারণে তাকে গ্রেপ্তার করে সাত বছর সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ, পল্টন ময়দানে মওলানা ভাসানীর আহ্বানে অনুষ্ঠিত জনসভায় ন্যাপের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ এবং প্রতীকী পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৭৪ সালে গ্রেপ্তার ও ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে তিনি কারামুক্ত হন। ১৯৭৬ সালে ভাসানীর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চের প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ভাসানীর মৃত্যুর পর ন্যাপের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। যারই ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন যাদু মিয়ার নাতি জেবেল রহমান গানি।
প্রতিটি সমাজ তার ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই জন্ম দেয় শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের তেমনই এক শ্রেষ্ঠ সন্তান হচ্ছেন যাদু মিয়া। রাজনৈতিক ক্যারিশমা কিংবা কর্মদক্ষতাই তাঁকে কিংবদন্তি করে তুলেছিল সারা দেশে। ইতিহাস কিংবা ইতিহাসের প্রেক্ষাপট আবর্তিত হয় যে কোনো দেশের সমাজ-সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার নিরিখেই। যে কোনো দেশের কোনো ব্যক্তি একজন মহান রাজনীতিবিদ হয়ে যান তাঁরই দেশের ইতিহাস কিংবা ঐতিহাসিকতার কারণে।
তিনি আজীবন তিনি সংগ্রাম করেছেন গণমানুষের মুক্তির জন্য। প্রতিবাদে প্রতিরোধে ও সংগ্রামে তিনি কখনো পিছপা হননি। জীবনের মোহের কাছে তিনি কখনো আত্মসমর্পণ করেননি। রাজনীতি ক্ষমতার লড়াই। কিন্তু সেই ক্ষমতার লড়াই যখন নিছক ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে পরিণত হয় তখন সেই রাজনীতি মানুষের কোনো কল্যাণ সাধন করতে পারে না। যাদু মিয়ার রাজনীতি হলো মানব কল্যানবাদের রাজনীতি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের রাজনীতি।
আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সকল আন্দোলন সংগ্রামেও আমাদের মাঝে নানা বিভেদ পরিলক্ষিত। এ বিভেদ ছিলো মত ও পথের। এত সব মতপার্থক্যের মাঝে দেশ এবং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের যে ক’জন ক্ষণজন্মা রাজনীতিক ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন, তাঁদের মধ্যে একজন হচ্ছেন মশিয়ূর রহমান যাদু মিয়া।
১৯৭৫ পরবর্তী পরিস্থিতির প্রয়োজনেই যাদু মিয়া জিয়াউর রহমানের সাথে আলোচনা শুরু করেন। আলোচনার উদ্দেশ্য ছিলো সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ। সেদিন তিনি এ কাজে এগিয়ে এসেছিলেন শান্তিপূর্ণ উপায়ে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রবর্তনের লক্ষ্যে। যাকে তিনি ‘গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রক্রিয়া’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রথমে ফ্রন্ট পরে বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। তিনি সেদিন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন নিজ হাতে গড়া প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকে। বোধহয় তাঁর মধ্যে একটা সন্দেহ ছিল। ত্যাগ করলেন ব্যক্তিগতভাবে তাঁর নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস।
১৯৭৯ সালের ১৮-ই ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি’র নিরঙ্কুশ বিজয়ের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ। নির্বাচনের আগে বিএনপি’র পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ছুটে বেড়ান। এতটুকু ক্লান্তি বা বিরক্তিবোধ করেননি। দুঃখের বিষয় নির্বাচনে বিএনপি যখন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে জয় লাভ করলো এবং তিনি যখন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচাইতে বড় সাফল্যের দ্বার প্রান্তে এসে উপনীত হলেন ঠিক সেই মুহূর্তে ১৯৭৯ সালের ১২ই মার্চ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এ মৃত্যু ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। অনেক প্রশ্নও রয়েছে এ মৃত্যু নিয়ে। যে সকল প্রশ্নের মীমাংসা আজও হয় নাই।
আজ ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতেও নীলফামারীর ডিমলার খগাখড়িবাড়ির জোদ্দার পুত্র রাজনীতির কিংবদন্তি ‘ধ্রুব মশাল’ যাদু মিয়ার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনযাত্রা নিয়ে আমাদের কৌতূহল একবিন্দুও কমেনি, বরং বেড়েছে। কেননা তাঁর রাজনীতি নিয়ে আলোচনা যতটা হয়েছে, মানুষ যাদু মিয়া সম্পর্কে আলোকপাত তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এক সময় রুচিশীল রাজনীতিকরা তাঁর সান্নিধ্য ও রসালাপ শোনার জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে থাকতেন। তারাও আজ হয়ত যাদু মিয়াকে ভুলে গেছেন। হয়ত এটাই স্বাভাবিক! যাদু মিয়ার জীবনের কথা বলার উত্তরসূরির অভাব আমাদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়।
লেখক : রাজনীতিক, কলাম লেখক ও রাজনীতিক বিশ্লেষক
খুলনা গেজেট/এএজে

